আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী:বিনয়ের অবয়ব

Spread the love

দিপু সিদ্দিকী

বাদ ফজরের সিগ্ধ, কোমল আলো মনে অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। এই আলো যখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বলতা ছড়ায়, তখন ভূবন আলোকিত হয়। সকালে মানে একটু আগেই মাথায় চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। অবচেতন মন কোনো প্রাপ্তিতে বিনয়ী হয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। ঘাটতে গিয়ে চোখের সামনে আসে একটি হাদিস। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘…আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উঁচু করেন।’ সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮।

এই হাদিসে বিনয়কে মর্যাদার আসল ভিত্তি বলা হয়েছে। সাধারণত আমরা মনে করি যে, সম্মান পেতে হলে নিজেকে বড় করে তুলতে হবে। কিন্তু ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে উল্টো পথ—যত বেশি বিনয়ী হওয়া যায়, আল্লাহ তত বেশি সম্মান দান করেন।

এই চিন্তার মধ্যেই মনে বার বার উঁকি দিচ্ছিল এক বুযুর্গের নাম। সিলেটের অন্যতম শীর্ষ আলেম আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী হুজুরের কথা। উনার শারীরিক অবয়ব ও আচরণে যে বিনয়ের ছাপ দেখা যায়, তা এই হাদিসের বাস্তব রূপ যেন। তিনি কখনো অহংকার বা প্রভাব বিস্তারের ভঙ্গিতে মানুষের সামনে দাঁড়ান না। বরং ধীর-স্থির ভঙ্গি, নম্র কণ্ঠস্বর ও শান্ত চাহনি দিয়ে তিনি মানুষের হৃদয় জয় করেন।

তার বক্তৃতা বা দাওয়াতি জীবনে লক্ষ্য করা যায়, নিজেকে সামনে না এনে তিনি সবসময় আল্লাহ ও রাসূল (সা.) এর শিক্ষাকে সামনে আনেন। এতে তার মর্যাদা মানুষের চোখে আরো বৃদ্ধি পায়, যা আসলে আল্লাহর প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন: “যে বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে উঁচু করেন।”

আচ্ছা, ধর্মীয় নেতৃত্ব মানেই কী আভিজাত্য বা দূরত্বের দেয়াল। বড় হুজুরের কথা শোনা আর দূর মানা। উনার পরিচ্ছন্ন কিংবা দামি পোশাক, টুপি দেখে শ্রদ্ধা জাগানো। আমার ধারণা, এমনটা অনুচিত। শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজের সাহচর্য পাওয়া তো অনেকের জন্য আকাঙ্খিত। অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে আচরণগত ব্যতয় ঘটে যায়। কিন্তু আমি আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলীকে যত দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি- হলো তাঁর সহজ-সরল অবয়ব আর সর্বদা বিনয়ী আচরণ।

তিনি মঞ্চে বসলেও কখনো আলাদা কোনো প্রভাব বিস্তারের ভঙ্গি তৈরি করেন না। নীরব ও শান্ত চাহনি, ধীরস্থির ভঙ্গি এবং কথার পরিমিত ব্যবহার তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাঁর হাঁটাচলা থেকে শুরু করে দাড়ানো বা বসা—সবকিছুতেই প্রকাশ পায় এক ধরনের বিনয়। সর্বশেষ শনিবার সিলেটে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর ৩৯তম দুই বংশধরের উপস্থিতিতে সভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি। পেশাগত কারণে ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও ফুটেজ কাটতে গিয়ে আবারো নজরে পড়ল আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরী ফুলতলীর বিনয়ী বসা। আহা! বসার মধ্যেও যে বিনয় থাকতে পারে ওনাকে না দেখলে তা বোঝা যেত না। নোট- ছবিটি মনোযোগ দিয়ে দেখুন, বসার ভঙ্গিতে কতটা বিনয়। শনিবার তোলা হয়েছে ছবিটি।)

পিতার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করে আজ তিনি ফুলতলী তরিকার একজন প্রধান মুখপাত্র। কিন্তু এ দায়িত্ব যেন তাকে ভারী করে তোলেনি, বরং আরো বিনয়ী করেছে। তিনি ওয়াজে বা পরামর্শে নিজের অবস্থান সামনে না এনে কোরআন-সুন্নাহর আলোচনায় মানুষকে টেনে নেন। এজন্য শ্রোতারা মনে করেন, তিনি কেবল একজন বক্তা নন, বরং একজন পথপ্রদর্শক যিনি নিজের অহম নয়, সত্য ও দীনকে সামনে রাখেন।

বিনয় সবসময় মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা তৈরি করে। আল্লামা ইমাদ উদ্দিন চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। উনার সাথে আমার সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও বিভিন্ন মাহফিলের ভিডিও বা ছবি দেখে, আমার উপলব্ধি, তিনি এমন একজন ওলি যিনি বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে অন্তরের স্বচ্ছতাকেই অগ্রাধিকার দেন

লেখক: সভাপতি, সিলেট ইলেক্ট্রনিক এন্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *