মেয়ের মধ্যে মায়ের প্রতিচ্ছবি : আব্দুল মুকিত

Spread the love

মাকে হারিয়েছি অনেক বছর হলো। সেই থেকে মা’র আদর-স্নেহ, শাসন সবই রয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। তখন বুঝতাম না, মা কেন ধমক দিতেন, কেন এত বলতেন পড়াশোনার কথা, সময়মতো খাওয়ার কথা। আজ বুঝি মা’র প্রতিটি ধমকের ভেতর ছিল গভীর মমতা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের জন্য নির্মোহ প্রস্তুতি।

এখন যখন আমার চার বছরের মেয়ে অজিহা আদর-মাখা ধমকে বলে,
“বাবা, ঘুমাতে যাওনি কেন?”
“এখন দরকারি কাজের সময় না, এখন ভাত খাওয়ার সময়।”
“ছিংলা (বেত) নিয়ে আসবো?”
বা মুখে চামচ ঠেলে দিয়ে আদেশের ভঙ্গিতে বলে, “খা খা, গিল গিল” তখন মনটা কেমন কেঁপে ওঠে। মনে হয়, মা-ই বুঝি ফিরে এসেছেন এই ছোট্ট শরীরে।

একদিন মেয়ের কথায় ঘুমাতে যাই, আবার একদিন ওর ধমকে খেতে বসি। ওর আদরের শাসনে মাথা নত হয়ে আসে। অথচ সেই আমি, জীবনের একসময় মায়ের কথা শুনিনি। অবাধ্যতা করেছি, কষ্ট দিয়েছি। আজ সে সব কথা মনে হলে বুকের ভেতর বিষাদের ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু সেই মা তো আর নেই, যার সামনে গিয়ে বলা যাবে “মা, ক্ষমা করে দিও।”

আমার মা আমাদের (আমি ও আমার ছোট ভাই হাসিব মানিক) সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। নিজে কষ্ট করেছেন, কিন্তু আমাদের হাসিমুখ দেখার জন্য কিছুই বাকি রাখেননি। তাঁর একটাই চিন্তা ছিল “আমার সন্তান।”

আজ কিছুটা স্বচ্ছলতা এসেছে, সুযোগ-সুবিধা এসেছে কিন্তু মা নেই! সব কিছু থেকেও জীবনটা অসম্পূর্ণ লাগে। মা তাঁর নাতি-নাতনীদেরও খুব ভালোবাসতেন। আজ তাঁর নাতনি অজিহা যখন বাড়িতে আসে, দাদির ঘরে বসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে
-“আমার দাদু কই?”
-“আল্লাহ বাড়ি চলে গেছে?”
-“আর আসবে না?”

শিশু মনও আজ অনুভব করে দাদু হারানোর বেদনা। ওর মুখে ‘আল্লাহ বাড়ি’ শুনে বুকটা হু হু করে ওঠে। মনে হয় যদি মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে ওকে কতটা ভালোবাসতেন, বুকে আগলে রাখতেন!

একদিন অজিহা দাদির ঘরের ধুলো-মাটিতে ভরা দৃশ্য দেখে বলে
“চলো, আমরা ঘরটা পরিষ্কার করি।”
আমি মাটি তুলতে থাকি, আর পাশে আমার সেই ছোট্ট মেয়ে হাতে হাত লাগিয়ে সহযোগিতা করে। মনে হয়, মা-ই বুঝি আবার ফিরে এসে বলছেন,
“ঘরটা একটু গুছিয়ে রাখো বাবা”

আজ আমার মেয়ের মধ্যেই প্রতিনিয়ত আমি আমার মাকে খুঁজি। হয়তো আল্লাহ জানতেন, মা হারানোর কষ্ট কতটা ভয়ংকর তাই মেয়ের রূপে মা’র ছায়া ফিরিয়ে দিয়েছেন আমার জীবনে। এই অনুভব কেবল আমার একার নয়। সমাজের হাজারও সন্তান আছেন, যারা মা-বাবাকে হারিয়ে বুঝতে পারেন মা-বাবা কী ছিলেন। কেউ হারিয়ে বুঝে, কেউ পাশে থেকেও বুঝে না কখনো বয়সের কারণে, কখনো উপলব্ধির অভাবে। সময় থাকতে যদি আমরা একটু বুঝে উঠতাম তাঁদের মর্ম, তাহলে আজ এত অনুশোচনায় ভুগতে হতো না।

আজ যারা মা-বাবার সান্নিধ্যে আছেন, তাঁদের প্রতি আমার আন্তরিক অনুরোধ মা বাবাকে ভালোবেসে সময় দিন, যত্ন করুন, কদর করুন। কারণ একদিন এই মানুষগুলো শুধু স্মৃতির পাতায় থাকবে। তখন শুধু একটাই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসবে, “কেন আমি একটু বেশি সময় দিলাম না?”

ছোট্ট একটি শিশুর আচরণ, কথাবার্তা একজন হারানো মায়ের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনতে পারে এটাই হয়তো জীবন। ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। আর মা?মা তো একজনই হন, জীবনে একবারই আসেন।

আমি এক অভাগা সন্তান, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের আগে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছি। বাবাকে হারিয়েছি অবুঝ বয়সে, মাকে পেয়েছি কিছুটা সময়, কিন্তু ততদিনে নিজের উপলব্ধি তৈরি হয়নি। অবুঝ মন, অপরিণত আচরণে অনেক কষ্ট দিয়েছি তাঁদের। সেই কষ্টই এখন আমাকে তাড়া করে, প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ।

মা-বাবার মূল্য জীবিত অবস্থায়ই দিন। কারণ, তাঁরা হারিয়ে গেলে কখনোই ফিরে আসেন না..


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *