এক প্রতিষ্ঠানে কেটেছে দুই যুগেরও অধিক সময়
সবার কাছে নানা নামেই পরিচিত ছিলেন কমরুদ্দিন।

রেদ্বওয়ান মাহমুদ:: কমরুদ্দিন আহমদ নামটাই আড়ালে ঢাকা পড়েছিল তার। ছোট-বড় সব বয়সী মানুষের কাছে নানা নামেই পরিচিতি পান তিনি। সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জকিগঞ্জের কাজলসার ইউনিয়নস্থ আটগ্রাম আমজদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সবচেয়ে বয়স্ক ছাত্র কমরুদ্দিন। পৈতৃক বাড়ি ফুলতলীর নুয়াঅনে হলেও জন্ম নানাবাড়ি কলাকুটায়। বাবা-মাসহ সকলেই থাকতেন নানাবাড়িতে। কৈশোর পেরোনোর পর মামার সাথে সপরিবারে ভারত যান। সেখান থেকে আবার ফেরেন নানাবাড়িতে। তবে এর আরো কিছুদিন পরে তিনি চলে আসেন বোনের বাড়ি আটগ্রামস্থ রায়গ্রামে। মূলত এখানেই তার বেড়ে ওঠা।
কমরুদ্দিনের জানার আগ্রহ ছিল তুমুল। জ্ঞানার্জনকে বয়সের পরিসীমায় বন্দি হতে দেননি তিনি। অনেকটা প্রাপ্তবয়সেই ১৯৯৬ ইংরেজীতে সুরমার তীর জুড়ে অবস্থিত আটগ্রাম মাদ্রাসায় তার হাতেখড়ি হয়। এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই যুগেরও অধিক সময় বিচরণ করেছেন তিনি। বয়স বেড়ে যাওয়ায় স্মৃতিশক্তি কিছুটা হ্রাস পেলেও প্রত্যয়ী ছিলেন কমরুদ্দিন। রোদ-বৃষ্টি, ঝড় সব উপেক্ষা করে ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত হতেন। এক হাতে ছাতা আর আরেক হাতে বই নিয়ে ক্লাস শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢুকতেন ক্যাম্পাসে। বয়সে বড় হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র-শিক্ষক সবার কাছেই তিনি ছিলেন প্রিয়ভাজন। ক্লাসের সবার সাথে মিশে দুরন্তপনায় মেতে থাকাই ছিল তার স্বভাব। আটগ্রাম আমজদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা আব্দুস সবুর জানান- ‘একজন অনুগত ছাত্র হিসেবে কমরুদ্দিন ছিলেন অনুকরণীয়। তিনি যে বয়সে সবার থেকে বড়, তার চলাফেরায় সেটি কখনো বুঝাই যেত না।’
ক্লাস সিক্স থেকে আটগ্রাম মাদ্রাসায় তার পড়ালেখার শুরু। দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনার পর স্বাভাবিকভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার কথা থাকলেও তিনি অন্যত্র যাননি। মাওলানা আব্দুস সবুর জানান- ‘মাঝে মাঝে কমরুদ্দিন বলতেন যতদিনই আছি এই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে চাই।’ একজন সহজ সরল মানুষ হিসেবে কমরুদ্দিন ছিলেন সর্বমহলে পরিচিত। সহজেই যে কোন বয়সী মানুষের সাথে মিশতে পারতেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সালাম জানান- ‘এই প্রতিষ্ঠানে সফরকালে কমরুদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়। তার সঙ্গে কথা বলে শেখার আগ্রহ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোলাগা দেখে আমি অবাক হই। কথার ফাঁকে কমরুদ্দিন বলতেন শিখতে কোন লজ্জা নেই।’ উল্লেখ্য, দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের একজন ছাত্রও ছিলেন তিনি।
দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জনে কোন কার্পণ্য করতে নেই, সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে নজির স্থাপন করে কমরুদ্দিন পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) দুপুরে আটগ্রামস্থ বোনের বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ইন্নালিল্লাহি…..রাজিউন। তার মৃত্যুর পর থেকে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করছেন। আমৃত্যু একজন জ্ঞানপিপাসু হিসেবে নজির গড়ে বিদায় নিলেন তিনি।