ঈসালে সাওয়াবের শরঈ বৈধতা -মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান

Spread the love

‘ঈসালে সাওয়াব’ একটি ফারসী পরিভাষা। এর অর্থ হলো-সাওয়াব পৌঁছানো। আরবীতে এর বহুল ব্যবহৃত পরিভাষা হলো- ‘ইহদাউস সাওয়াব’। কোন নেক আমল করে এর সাওয়াব মৃত ব্যাক্তিকে হাদিয়া করা বা দান করাকে ঈসালে সাওয়াব বলে।
ঈসালে সাওয়াব তথা জীবিতদের কৃত নেক আমলের সাওয়াব মৃতদের দান করা শরীআত স্বীকৃত একটি বিষয়। এরকম দানের মাধ্যমে মৃতরা উপকৃত হন। ঈসালে সাওয়াবের বৈধতা নিয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের কারো দ্বিমত নেই, তবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং পদ্ধতি নিয়ে কিঞ্চিত মতভেদ আছে। ভ্রান্ত ফিরকা সমূহের মু’তাযিলী সম্প্রদায় ঈসালে সাওয়াবকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। তাদের দৃষ্টিতে জীবিতদের দান করা কোনো আমলই মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণকর নয়, এমনকি দুআ-ইস্তিগফার, দান- সদকাও নয়। আমাদের তথা আহলুস সুন্নাহ’র গ্রহণযোগ্য রায় হলো জীবতদের কৃত নেক আমলের সাওয়াব যদি মৃতদের হাদিয়া করা হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা সেটা তাদের পৌছিয়ে দেন, সাথে আমলকারীও সাওয়াব লাভ করে।
ইসলামী শরীআতে ইবাদাত বিভিন্ন প্রকার। কোন ইবাদাত শুধু শারীরিক ; যেমন- নামায, রোযা ইত্যাদি। কোন ইবাদাত শুধু আর্থিক তথা সম্পদ কেন্দ্রিক; যেমন- যাকাত, দান-সদকাহ ইত্যাদি। আবার কোন ইবাদত এ উভয়টার সমন্বয়ে। যেমন- হজ্জ। জীবিত ব্যক্তিদের কৃত এ সকল প্রকার ইবাদতের সাওয়াব মৃতদের হাদিয়া করা তথা ঈসালে সাওয়াব করা শরীআত সম্মত।
কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَ الَّذِیْنَ جَآءُوْ مِنْۢ بَعْدِهِمْ یَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِاِخْوَانِنَا الَّذِیْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِیْمَانِ وَ لَا تَجْعَلْ فِیْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ۠
অর্থ- এবং (ফাই-এর সম্পদ তাদেরও প্রাপ্য আছে ) যারা তাদের (অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদের) পরে এসেছে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! ক্ষমা করুন আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদেরও যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু। (সূরা হাশর : ১০)
এ আয়াতে দুই শ্রেণির মুমিনদের আলোচনা করা হয়েছে- এক. পূর্ববর্তী মুমিনগণ, দুই. পরবর্তী মুমিনগণ।
আয়াতে পরবর্তী সেই সকল মুমিনগণের প্রশংসা করা হয়েছে যারা নিজেদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং তাদের পূর্ববর্তী মুমিনগণের জন্য ক্ষমা চায়। আর পূর্ববর্তী যারা ঈমানদার তাদের মধ্যে জীবিত এবং মৃত সকলেই অন্তর্ভূক্ত, তাছাড়া পূর্ববর্তী যারা মুমিন তাদের অধিকাংশই মৃত্যুবরণ করেছেন। আয়াতে সকলকেই অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।
আয়াতে পূর্ববর্তী মুমিনদের জন্য দুআ করার প্রশংসা করা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় জীবিত কেউ যদি মৃতদের জন্য দুআ করে তাহলে সে দুআর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হন। এখন দুআ যদি তাদের জন্য উপকারী না হয়, তবে এ প্রশংসার কী অর্থ থাকে?
ইমাম সাখাবী রহ. বলেন, এখানে পূর্ববর্তীদের জন্য দুআ করায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। বোঝা গেল যে, দুআ উপকারে আসে। (কুররাতুল আইন পৃ. ১২৩)

অর্থাৎ কুরআনের আয়াত প্রমাণ করছে, জীবিতদের দুআ মৃতদের উপকারে আসে। আর সে জন্যে দেখা যায় নবীগণের মধ্যে অনেকেই মুমিনদের জন্য দুআ করেছেন। যাদের দুআয় সার্বিকভাবে সকল মুমিন অন্তর্ভূক্ত। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এ দুআ বর্ণিত হয়েছে, رَبَّنَا اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِلْمُؤْمِنِیْنَ یَوْمَ یَقُوْمُ الْحِسَابُ. (হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল ঈমানদারকে ক্ষমা করুন।) হযরত নূহ আ. এর দুআর কথা বর্ণিত হয়েছে- رَبِّ اغْفِرْ لِیْ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنْ دَخَلَ بَیْتِیَ مُؤْمِنًا وَّ لِلْمُؤْمِنِیْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتِ وَ لَا تَزِدِ الظّٰلِمِیْنَ اِلَّا تَبَارًا۠. (হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার পিতা-মাতাকেও এবং যে ঈমান অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও।)
এ দুআগুলোতে জীবিত-মৃতের পার্থক্য ছাড়া সাধারণভাবে মুমিনদের জন্য দুআ করা হয়েছে। এটাই প্রমাণ করে, দুআর মাধ্যমে জীবিত-মৃত সকলেই উপকৃত হন। আর দুআ নিজেই এক প্রকার ইবাদত। হাদীস শরীফে এসেছে- إن الدعاء هو العبادة (দুআ হলো ইবাদাত, মুসনাদে আহমদ; হাদীস নং : ২৭১)
জীবিতদের দুআর মাধ্যমে মৃতরা যেভাবে উপকৃত হন ঠিক একইভাবে জীবিতদের নেক আমলের মাধ্যমেও মৃতরা উপকৃত হয়। এর অনেক প্রমাণ হাদীসে নববীতে বিদ্যমান। সংক্ষিপ্ততার জন্য একই বিষয়ে একাধিক হাদীস উল্লেখ না করে কেবল একটি করে হাদীস উল্লেখ করছি।

সাদকার মাধ্যমে উপকার লাভ

জীবিত কোন ব্যক্তি যদি মৃত কারো ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে কোন কিছু সাদকাহ করে তাহলে এই সাদকার সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকেন। হাদীস শরীফে সহীহ সনদে এ সংক্রান্ত অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এখানে কেবল একটি হাদীস উল্লেখ করছি।
عن عائشةَ رَضِيَ اللهُ عنها: أنَّ رجلًا قال للنبيِّ صلَّى الله عليه وسلَّم: إنَّ أمِّي افتُلتَتْ) نفسُها، وأظنُّها لو تكلَّمَتْ تصدَّقَتْ؛ فهل لها أجرٌ إن تصدَّقتُ عنها؟ قال: نعمْ
অর্থ: হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললো- আমার মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন। [কিছু বলে যেতে পারেননি] আমার ধারণা! তিনি যদি কিছু বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে আমাকে তার নামে সদকা করতে বলতেন। এখন আমি যদি তার নামে সদকা করি, তাহলে কি এর সাওয়াব তিনি পাবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ [তিনি এর সাওয়াব পাবেন]। [বুখারী: হাদীস নং-১৩৮৮, মুসলিম: হাদীস নং ১০০৪]
এ হাদীস থেকে বুঝা গেল জীবিত কেউ যদি মৃত কারো জন্যে সাদকাহ করে তাহলে মৃত ব্যক্তি এর সাওয়াব পেয়ে থাকেন। ঠিক একইভাবে ইবাদতে মালিয়্যাহ’র অন্তর্ভূক্ত অন্য কোন কিছু সাদকাহ করলেও এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকেন। সাদকার মাধ্যমে মৃতদের প্রতি ঈসালে সাওয়াব সম্পর্কে ইমাম নববী র. বলেন, জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃতের উদ্দেশ্যে সাদকাহ করা হলে এ সাদকাহর সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পান এবং উপকৃত হন। এ বিষয়ে সকল মুসলমান একমত। (শরহুন নববী, ১১/১২১)

মৃতের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ، جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ فَلَمْ تَحُجَّ حَتَّى مَاتَتْ، أَفَأَحُجُّ عَنْهَا؟ قَالَ: ্রنَعَمْ حُجِّي عَنْهَا، أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَةً؟ اقْضُوا اللَّهَ فَاللَّهُ أَحَقُّ بِالوَفَاءِ
হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। জুহাইনা এলাকার এক মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, আমার আম্মা হজ্ব করার মান্নত করেছিলেন, কিন্তু হজ্ব করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি কি এখন তার পক্ষ থেকে তা আদায় করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ, তুমি তার পক্ষ থেকে আদায় কর। তোমার মায়ের যিম্মায় যদি ঋণ থাকতো, তাহলে কি তুমি তা আদায় করতে না? তেমনি এটাও আদায় কর। কারণ আল্লাহ তাআলাই অধিক হক রাখেন যে, তার সাথে কৃত অঙ্গিকার পূর্ণ করা হবে। [বুখারী, হাদীস নং-১৮৫২]
এ হাদীসে মৃতের পক্ষ থেকে হজ্জ করার বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং মৃতের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে এবং এর সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পাবে।

কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব পৌঁছানো

কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের রূহের উপর হাদিয়া করলে মৃতরা এর দ্বারা উপকার লাভ করেন। কেননা হাদীস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতদের উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, اقرءوا يس على موتاكم (তোমরা তোমাদের মৃতদের উদ্দেশ্যে ইয়া-সীন তিলাওয়াত করো। সুনান আবি দাঊ, হাদীস নং-২৭১৪)
ইমাম তাহাবী র. বলেন, হজ্জ এবং রোযার সাওয়াব যেভাবে মৃত ব্যক্তির নিকট পৌছে তদ্রæপ খালিস নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের উদ্দেশ্যে ঈসালে সাওয়াব করলে সেটাও পৌছে। (শরহুল আকীদাতিত তাহাবীয়্যাহ, ২/৬৭৩) ইমাম ইবনু কুদামাহ হাম্বলী র. বলেন, কুরআন কারীম তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করলে এর সাওয়াব মৃতের কাছে পৌছে, এ বিষয়ে মুসলমানগণ একমত। (আল মুগনী,৩/৫২২)
তাছাড়া কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে। কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে-
عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ الْعَلَاءِ بْنِ اللَّجْلَاجِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ لِي أَبِي: ” يَا بُنَيَّ إِذَا أَنَا مُتُّ فَأَلْحِدْنِي، فَإِذَا وَضَعْتَنِي فِي لَحْدِي فَقُلْ: بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ، ثُمَّ سِنَّ عَلَيَّ الثَّرَى سِنًّا، ثُمَّ اقْرَأْ عِنْدَ رَأْسِي بِفَاتِحَةِ الْبَقَرَةِ وَخَاتِمَتِهَا، فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ ذَلِكَ
অর্থ: হযরত আব্দুর রহমান বিন আলা বিন লাজলাজ, তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, আমার পিতা আমাকে বলেছেন, হে বৎস! আমি যখন মারা যাবো, তখন আমার জন্য “লাহাদ” কবর খুড়বে। তারপর আমাকে যখন কবরে রাখবে তখন পড়বে “বিসমিল্লাহি ওয়াআলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ” তারপর আমার উপর মাটি ঢালবে। তারপর আমার মাথার পাশে সূরা বাকারার শুরু এবং শেষাংশ পড়বে। কেননা, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এমনটি বলতে শুনেছি। [আলমুজামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-৪৫১, সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৭০৬৮]
এ হাদীস সম্পর্কে আল্লামা হায়ছামী রহঃ বলেন- رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِيرِ، وَرِجَالُهُ مُوَثَّقُونَ. অর্থাৎ-এ হাদীস ইমাম তাবারানী তার কাবীরে বর্ণনা করেছেন, এবং তার প্রত্যেক রাবী সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। [মাযমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-৪২৪৩]
অনুরূপভাবে জীবিতদের যাবতীয় নেক কার্যাবলির মাধমে মৃতদের উদ্দেশ্যে ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ। সেটা দুআ, ইসতিগফার, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, সদকাহ, কুরআন তিলাওয়াত সহ যে কোন নেক কাজ করে এর সাওয়াব মৃতদের রূহের উপর বখশানো তথা হাদিয়া করা বৈধ। এ বিষয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আইম্মায়ে কিরাম একমত।
হানাফী মাযহাবের আইম্মায়ে কিরামের সম্মিলিত রায় সম্পর্কে আল্লামা ইবনু আবিদীন শামী র. বলেন, আমাদের ফকীহগণ ‘অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায়’ শীর্ষক অধ্যায়ে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একজন ব্যক্তি স্বীয় নেক আমল তথা নামায, রোযা, সদকাহ অথবা যে কোন নেক আমলের সাওয়াব অন্য ব্যক্তিকে হাদিয়া করতে পারবে। (আদ-দুররুল মুখতার, ২/২৪৩) ইমাম কাসানী র. বলেন-
مَنْ صَامَ أَوْ صَلَّى أَوْ تَصَدَّقَ وَجَعَلَ ثَوَابَهُ لِغَيْرِهِ مِنْ الْأَمْوَاتِ أَوْ الْأَحْيَاءِ جَازَ وَيَصِلُ ثَوَابُهَا إلَيْهِمْ عِنْدَ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ
অর্থ : যে রোযা রাখল বা নামায আদায় করল অথবা সদকাহ করল এবং এর সাওয়াব জীবিত বা মৃত অন্য কাউকে হাদিয়া করে দিলে বৈধ হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, তাদের কাছে এর সাওয়াব পৌঁছবে। (বাদায়ে‘ : ৩/২৭০)
এ বিষয়ে মালিকী মাযহাবের গ্রহণযোগ্য রায়ের জন্য দেখতে পারেন ফকীহ মুহাম্মদ ইবনু আব্দির রাহমান আল মলিকী র. এর ‘মাওয়াহিবুল জালীল’ ২য় খÐ, হাম্বলী মাযহাবের রায়ের জন্য ইবনু কুদামাহ হাম্বলী র. এর ‘আল মুগনী’ শাফেঈ মাযহাবের রায়ের জন্য ইমাম নববী র. এর ‘শরহু মসলিম’ ১১তম খণ্ড।

দুটি আপত্তি এবং তার জবাব

আপত্তি নং-১: কুরআন কারীমে ইরশাদ করা হয়েছে, وأن ليس للإنسان إلا ما سعى (অর্থ: মানুষ তাই পায় যা সে করে) সুতরাং এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, জীবিতদের কোন আমলই মৃতদের কোন উপকারে আসবে না।
জবাব : ইমাম কুরতুবী হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বলেন, আয়াতটির হুকুম মানসূখ। প্রখ্যাত তাবেঈ ইকরামা বলেন, আয়াতটি হযরত ইবরাহীম আ. এবং হযরত মূসা আ. এর উম্মত প্রসঙ্গে নাযিল হয়েছে। সুতরাং আয়াতটির হুকুম তাদের জন্যে প্রযোজ্য হবে, আমাদের জন্য নয়। আমাদের জন্য তথা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নিজের কৃত আমলের সাথে অন্যে আমলও যুক্ত হবে। البحر المحيط، لأبي حيان ৮/ ১৬৮

আপত্তি নং-২ : হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মানুষ যখন মারা যায় তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়…। সুতরাং এতে বুঝা যায় জীবিতদের পক্ষ থেকে কোন কিছু পাঠালেও মৃতরা উপকৃত হবে না।
জবাব : হাদীসে বলা হয়েছে মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি নিজে আর কোন আমল করতে পারবে না। হাদীসে তো এ কথা বলা হয় নি যে, অন্যের পাঠানো আমলও কোন উপকারে আসবে না।
শায়খ ইবনে তাইমিয়ার একটি ফতওয়া উল্লেখ করলে উপরের দুই আপত্তির উত্তম জবাব হবে। শায়খ ইবনু তাইমিয়া বলেন, কুরআন কারীমের আয়াতে বা হাদীসে উল্লেখ নেই যে, মৃতরা সৃষ্টিজগতের অন্যান্যের দুআর মাধ্যমে উপকৃত হবে না। অথবা এ কথাও নেই যে, মৃতদের উদ্দেশ্যে যে নেক আমল করা হয় তা থেকেও তারা কোন উপকার লাভ করতে পারবে না। বরং ইসলামের বিদ্বানগণ তথা আইম্মায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত যে, জীবিতদের দুআ, নেক আমলের মাধ্যমে মৃতরা উপকৃত হন। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা দ্বারা এটি প্রমাণিত। যে এই ইজমার বিরোধিতা করবে সে বিদআতী। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৪/৩০৬-৩১২)

নির্দিষ্ট দিনে ঈসালে সাওয়াব মাহফিল

শরীআত কর্তৃক অনুমোদন ছাড়া অন্য কোন দিনকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ঠ মনে করা অনুচিত। ঈসালে সাওয়াব বৎসরের যে কোন দিন করা যায়। তবে আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার জন্য কোন দিনকে নির্দিষ্ঠ করা শরীআত পরিপন্থী নয়। বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র হাদীসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদীস শরীফে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে বিভিন্ন সময়ে নসীহত করতেন। পুরুষ সাহাবীগণের আধিক্যতার কারণে মহিলা সাহাবীগণের অসুবিধা সৃষ্টি হত। এ সম্পর্কে জনৈক মহিলা সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবগত করলে রাসূল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- اجتمعن في يوم كذا وكذا في مكان كذا وكذا (তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক অমুক জায়গায় একত্রিত হবে, সহীহ বুখারী : হাদীস নং ৭৩১০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলা সাহাবীদের সুযোগ-সুবিধার কথা চিন্তা করে নসীহতের জন্য কিছু দিনকে নির্দিষ্ঠ করে নিলেন। তদ্রুপ বুখারী শরীফের (হাদীস নং-১১৬২) আরেকটি হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শনিবার দিনকে নির্দিষ্ঠ করেছিলেন মসজিদে কুবায় যাওয়ার জন্য। তিনি প্রত্যেক শনিবার মসজিদে কুবায় গমন করতেন। একইভাবে হাদীসে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বছরে একবার উহুদের শহীদগণের যিয়ারতে যেতেন।
হাদীস থেকে বুঝা গেল, কোন নেক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুবিধার্তে কোন দিনকে নির্দিষ্ঠ করা দোষণীয় নয়, তবে দিনটিকে আলাদা মর্যাদাপূর্ণ বা দিনটিকে আবশ্যকীয় মনে করা ভুল।
আল্লাহর কোন ওলীর ওফাতের তারিখকে কেন্দ্র করে ঈসালে সাওয়াব মাহফিল করার পিছনে অনেক নেক উদ্দেশ্য থাকে। যেমন, এ দিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গা থেকে আল্লাহর অনেক নেক বান্দাহ একত্রিত হন, কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির-আযকারের মাজলিস হয়, মুরিদীন-মুতাআল্লিকীন পরস্পরে সাক্ষাত হয়। এরকম একত্রিত হওয়াকে নাজায়য বলার মতো কোন কারণ নেই। ওলী আল্লাহগণের ওফাতের তারিখে মাহফিল করা বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য হাজী ইমদাদুল্লাহ মক্কী র. এর ‘ফয়সালায়ে হাফত মাসায়েল’, অথবা ফতওয়ায়ে রশিদিয়া দেখা যেতে পারে।


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *