জকিগঞ্জ টিভি:: বিজ্ঞানচর্চায় মুসলমানদের অবিস্মরণীয় অবদানকে তুলে ধরলো দারুল আজহারের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা!
বিজ্ঞানের জনক কুরআন। আর এই কুরআন মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ। বিজ্ঞানচর্চায় মুসলমানদের অবদান অবিস্মরণীয়। অনেকে এমন ধারনা পোষণ করে থাকেন যে- মুসলমানদের মাঝে উল্লেখযোগ্য তেমন কোন বিজ্ঞানী নেই। অথচ এ তথ্য যেমন সঠিক নয়, তেমনি ইতিহাস নির্ভরও নয়। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই যেখানে ইসলাম এবং মুসলমানরা কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেনি। বিজ্ঞানচর্চায় মুসলমানদের অবিস্মরণীয় সেই অবদানকে আজ তুলে ধরলো দারুল আজহারের ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা। কিন্তুু সেই ঐতিহ্য ও কৃতিত্ব আজ মুসলমানরা ভুলে যাচ্ছে। গত রোববার ২৪ নভেম্বর দারুল আযহার মডেল মাদরাসার উদ্যোগে সিলেটের শাহজালাল উপশহরস্থ ক্যাম্পাস সংলগ্ন মাঠে আয়োজিত বার্ষিক বিজ্ঞান মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বক্তারা উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।

মাদরাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মনজুরে মাওলার সভাপতিত্বে এবং শিক্ষক শাহিদ হাতিমী ও খ্যাতিমান উপস্থাপক আহমদ মাহফুজ আদনানের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন দারুল আযহার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান, প্রখ্যাত গবেষক ড. মুস্তাফিজুর রহমান ফয়সল। প্রধান আলোচক ছিলেন অধ্যাপক সাইফ উদ্দীন আহমদ খন্দকার। মাদরাসা পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাওলানা ইমদাদুর রহমান চৌধুরীর স্বাগত ও উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে সুচিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য পেশ করেন সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট মাওলানা শাহীনূর পাশা চৌধুরী, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা তাফাজ্জুল হক আজীজ, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সিলেট জোনাল হেড মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ, মেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক মাওলানা আব্দুল হান্নান, মুফতি মিনহাজ উদ্দিন মিলাদ, প্রকৌশলী শাহজাহান কবির ডালিম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন, সাংবাদিক কামরুল আলম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন পৃথিবীতে যতো বিজ্ঞান এসেছে সবগুলোই পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে, সুতরাং আমাদেরকে মহাগ্রন্থ আল কুরআন আঁকড়ে ধরতে হবে। আমাদের পূর্বসূরীরা শুধু শিক্ষা নিয়েই বসে থাকেন নি; বরং ইহজাগতিক প্রভূত পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় তাদের বিচরণ ছিলো উল্লেখ করার মত ।

উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক ইমদাদুর রহমান চৌধুরী বলেন- জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূচনা যাদের হাতে হয়েছে, সেসব মুসলিম বিজ্ঞানীদের মতো দারুল আজহারের সন্তানরাও শুধু পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্থ থাকবে, তা হয়না! একদিন তারাও হবে যুগের ইবনে সীনা, ইবনে হাইয়ান। সে লক্ষ্যে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি আমাদের ক্যাম্পাসে একটি সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠার।

সভাপতির বক্তব্যে মাওলানা মনজুরে মাওলা বলেন শিক্ষার্থীদের ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে পারদর্শী হতে হবে। তাহলে মুসলমানরা ফিরে পাবে তাদের অতীত ও স্বর্নালী ঐতিহ্য।
দারুল আজহার মডেল মাদরাসার ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের অন্যতম আবিষ্কার ‘লেবু থেকে বিদ্যুৎ’। ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহফুজ এই প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তার সাথে রয়েছে মাসউদ। মাহফুজ জানালো, ‘লেবুর ভেতরে থাকে প্রচুর পরিমাণে সৌরশক্তি। যেটি কাজে লাগিয়ে অনায়াসে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। লেবু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি এলইডি বাল্ব জ্বালাতে ১০টি লেবু জিংকের পাত, ১০টি তামার পাত ও সামান্য তার ও দুটি আলাদা ধাতব দণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। ধাতব দণ্ডের মধ্যে রয়েছে একটি অ্যানোড বা (নেগেটিভ) এবং অন্যটি ক্যাথোড বা পজেটিভ’। এরপর দণ্ড লেবুর দুই প্রান্তে গেথে আর দণ্ডের অপর প্রান্তের সাথে দুইটি পরিবাহী লাগানো হয়েছে। পরবর্তীতে অ্যাসিডিক পদার্থকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়েছে। আরেকটি আবিষ্কার ছিলো “রেইন ডিটেক্টর” এটিদ্বারা বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা তা ঘরের ভেতরে বসে অনায়াসে বলা দেওয়া যাবে! এটার মডারেটর ছিলো ৯ম শ্রেণীর ছাত্র আহবাব আহমদ। মেলায় আরেকটি সাড়া জাগানো আবিষ্কার ‘পেরিস্কোপ’। এর আবিষ্কারক সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র তানভীর । সে বলে- “যুদ্ধের সময় শত্রুবাহীনীর অবস্থান নির্ণয়ের জন্য এ যন্ত্রটি খুবই কার্যকর”।এরকম অনেক প্রজেক্ট নিয়ে দারুল আজহারের ক্ষুধে বিজ্ঞানীরা মুগ্ধ করেছে শত শত পুরুষ মহিলা ও শিশু দর্শকদের।

বিজ্ঞান মেলার স্টলে দারুল আজহার মডেল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা প্রদর্শন করেন ১৭টির মতো বিভিন্ন প্রযুক্তি!
১। বেসিক স্টীম টার্বাইন ২। নিউটনের চাকতি ৩। হাইড্রলিক লিফট ৪। বেসিক বায়োগ্যাস প্লান্ট ৫। রেইন ডিটেক্টর ৬। উইন্ড টার্বাইন ৮। জবা ফুল দিয়ে এসিড ও ক্ষার আলাদাকরন ৯। কৃত্রিম ঝর্ণা প্রস্তুতকরণ ১০। পানি পরিশুদ্ধকরণ ফিল্টার ১১। ভর নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ১২। আধুনিক শহরের রোল মডেল ১৩। পেন্সিলের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ ১৪। লাইন ফলোয়ার রোবট ১৫। জ্যামবিহীন রাস্তার ধারণা ১৬। পানির অপচয় রোধক প্রযুক্তি ১৭। আধুনিক ক্রেন প্রযুক্তি
বিজ্ঞান মেলায় আগত অভিভাবক, সুধী শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীদের পদভারে মুখরিত ছিল মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে আজহার শিল্পী গুষ্ঠি ও অতিথি শিল্পীরা। তেলওয়াত পরিবেশন দারুল আজহার মাদ্রাসার ক্ষুদে হাফেজ ক্বারীগণ।
পরিশেষে মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা তাফাজ্জুল হক আজীজ সাহেবের হৃদয়গ্রাহী মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।