২১ নভেম্বর ১৯৭১ সকাল রক্তে ভেজা শিশির দিয়ে শুরু হয় জকিগঞ্জের, ভারতীয় অফিসার মেজর চামন লাল কাস্টম ঘাট হয়ে নদীর তীরে উঠার সময় লুকিয়ে থাকা এক পাক সেনার গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আর এইভাবে শুরু হয় বাংলাদেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল শহর জকিগঞ্জের বিজয়ের সকাল। জকিগঞ্জের পোস্ট অফিস থেকে পাক সেনাদের ৭/৮জন অফিসার কে বন্দী করা হয় ভারী মিশনের অস্ত্রসস্ত্রসহ। এদিকে পুরো জকিগঞ্জ উপজেলা কে হানাদার মুক্ত করার জন্যে ক্যাপ্টেন রব, লে. গিয়াস ও লে. জহিরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী এবং মেজর জিয়াউর রহমানের (সাবেক প্রেসিডেন্ট) নামে গঠিত জেড ফোর্সের একটি কোম্পানি নিয়ে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান ও মেজর হাফিজ উদ্দিন ও ভারতীয় বাহিনী সহ আটগ্রামে আক্রমণ শুরু করলে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয় উভয়ের মাঝে। সেখানে পাক বাহিনীর একজন অফিসার সহ ৫০/৬০ জন নিহত হয় এবং বেশ কয়েক জন কে বন্দী করা হয়, অন্যদিকে ভারতীয় যৌথ বাহিনীর ক্যাপ্টেন জুরি সহ কয়েকজন মুক্তিকামী সৈনিকের মৃত্যু হয়। কানাইঘাট যাওয়ার পথ সড়কের বাজারের কাছে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান শহীদ হন এবং তাকে সড়কের বাজারের পশ্চিম ঈদগাহ নামক স্থানে দাফন করা হয়। ২২নভেম্বর শ্রীমঙ্গলের ধলাই ইপি আর ক্যাম্প অপারেশনের পর আটগ্রাম নদী পার হয়ে এসে জেড ফোর্স প্রধান মেজর জিয়াউর রহমান জকিগঞ্জে প্রবেশ করেন ও জকিগঞ্জ কাস্টম ঘাট দিয়ে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। আর তখন নির্দেশ আসে তাকে শালুটিকর যাওয়ার জন্যে আর এবারও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নদী পার দিয়ে জকিগঞ্জ হয়ে রতনগঞ্জের রাস্তা দিয়ে কানাইঘাট হয়ে শালুটিকরের উদ্দেশ্যে চলে যান। আর এই ভাবেই সারাদেশের মধ্যে গৌরাবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন মুক্তাঞ্চল হয় জকিগঞ্জ উপজেলা। ২২নভেম্বর১৯৭১ জনাব আব্দুল লতিফ, ইসমত আহমদ চৌধুরী, আব্দুল মুঈদ চৌধুরী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করেন জাতীয় পতাকা। দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে জকিগঞ্জে বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে স্থানীয় এমএলএ জনাব আব্দুল লতিফ ও অন্যান্য নেতৃবন্দ এবং মিত্রবাহিনী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ২৯ নভেম্বর ১৯৭১ সালে জকিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনাব দাউদ হায়দার কে জকিগঞ্জের বেসামরিক প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়।

এভাবেই দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল শহর জকিগঞ্জ উপজেলার স্বাধীন বাংলাদেশে পথ চলা শুরু হয়। আফসোস! বড়ই আফসোস!! দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের এত বড় একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজ স্বীকৃতির অভাবে এই ভাবে মুছে যেতে বসেছে, স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোকেরা মাঝে মাঝে এ নিয়ে সভা সেমিনার করে যান কিন্তু এতে আশানুরুপ কোন ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আশাকরি এই বিষয়টি মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সহ সরকার কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিয়ে দেশের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কে পৃথিবীর বুকে তুলে ধরবে।আমরা জকিগঞ্জ বাসী আমাদের ন্যায্য দাবি অর্জন করবো এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান যারা জকিগঞ্জ কে মুক্তাঞ্চল করতে আত্মত্যাগ করে গিয়েছেন তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদান করা হবে এর মাধ্যমে….
লিখেছেন- জামাল আহমদ।