ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিড জর্জ হোগার্থ লিখেছেনঃ “গুরুত্বপূর্ণ কিংবা তুচ্ছ; তাঁর (মুহাম্মদ ﷺ) প্রতিটি দৈনন্দিন আচরণ (মুসলিমদের জন্য) অনুশাসন, যা আজ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ সচেতনভাবে অনুকরণ করে যাচ্ছে। গুণ ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অন্য কোনো ধর্মপ্রবর্তক ওই সম্মানের জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি, যেখানে পৌঁছেছেন মুসলমানদের নবী।”
[Arabia, Oxford, 1922, p. 52]
আমাদের নবী ﷺ-এর জীবনের সবচেয়ে বড় মানবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে Simplicity. নিতান্তই সহজ-সরল স্বাভাবিক ছিল তাঁর জীবন। তিনি যা করতেন, সবই ছিল স্পষ্ট। হাটার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে হাটতেন। দ্রুত পথ চলতেন। কারও দিকে তাকাতে হলে পুরোপুরি তাকাতেন। দেখা হলে আগে সালাম দিতেন, মুচকি হাসতেন, হাত বাড়িয়ে দিতেন। অতি সাধারণ পোশাক পরতেন। খাবার নিয়ে কখনও আপত্তি করতেন না। থালার একপাশ থেকে খাবার খেতেন। খাওয়ার পর আঙুল চেটে পরিষ্কার করতেন। মাথায় তেল দিয়ে চুল আচড়াতেন। মাটির ঘরে খেজুরের চাটাইয়ের ওপর ঘুমাতেন। সাহাবিদের নিয়ে বসতেন, সুখ-দুঃখের গল্প করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করতেন। প্রয়োজন হলে বাজারে যেতেন। আযানের শব্দ শুনলে দুনিয়া থেকে বিমুখ হয়ে যেতেন। প্রচুর রোজা রাখতেন। নিজের ভাগের কাজ নিজেই করতেন। উটের পিঠে বসা অবস্থায় হাতের ছড়ি মাটিতে পড়ে গেলেও কাউকে তুলে দিতে বলতেন না। উট বসিয়ে নিজেই ছড়িটি তুলে আনতেন। কাউকে ধমকাতেন না। রাগ করলে আবার দ্রুত খুশি হয়ে যেতেন। সবাই যখন হাটত, তিনিও হাটতেন। সবাই বসলে তিনিও বসতেন। কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে উপস্থিত হতেন। বাচ্চারা এসে খেলাচ্ছলে তাঁর হাত ধরত। তিনি কখনও নিজে থেকে হাত ছাড়িয়ে নিতেন না। ভিখারিকে খালি হাতে বিদায় দিতেন না। সামান্য হাদিয়া পেলে গরিব সাহাবিদের সাথে ভাগ করে খেয়ে নিতেন। কোনো দ্বিচারিতা ছিলনা, কোনো ভান ছিলনা, কোনো লুকোছাপা ছিলনা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আর. বি. স্মিথ (১৭৯৪-১৮৮৪) যথার্থ বলেছেনঃ “তিনি (মুহাম্মদ ﷺ) ছিলেন একইসাথে ধর্মগুরু এবং সম্রাট। তবে তাঁর মধ্যে ধর্মগুরুদের মতো ভণ্ডামি ছিলনা। সম্রাটের মতো বিশাল সেনাবাহিনী ছিলনা। না ছিল কোনো বডিগার্ড, না প্রাসাদ, না বেতন। যদি পৃথিবীর একজন মানুষ এই দাবী করার যোগ্য হন যে, তিনি খোদায়ী শক্তিতে দুনিয়া শাসন করেছেন, তিনি হচ্ছেন মুহাম্মদ।”
[Mohammed and Mohammedanism, London, 1874, p. 235]
মাত্র ছয় বছর বয়সে আমাদের নবী ﷺ মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরে যখন মায়ের কবর যিয়ারতে গেছেন, তখন কবরের পাশে বসে শিশুর মতো কেঁদেছেন। বহু বছর পর যখন দুধ মা হালিমা সাক্ষাৎ করতে এসেছেন, আমার নবী নিজের পরনের চাদর বিছিয়ে দিয়েছেন হালিমার জন্য। যে উম্মে আইমান তাঁকে ছোটকালে দেখাশুনা করেছেন, আমার নবী কখনও তাঁকে চোখের আড়াল করেননি। যে নারী তাঁকে মায়ের স্নেহে লালনপালন করেছেন, সেই চাচী (আবু তালিবের স্ত্রী) ফাতিমা বিনতে আসাদকে কবরে রাখার পূর্বে আমার নবী নিজে ওই কবরে শুয়েছেন। প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাকে জীবনভর ভালবেসে গেছেন। বলেছেনঃ “তাঁর ভালোবাসা আমাকে রিযিক হিসেবে দিয়ে দেয়া হয়েছে” [সহীহ মুসলিম]। আমেরিকান ইতিহাসবিদ ওয়াশিংটন আর্ভিং লিখেছেনঃ “যখন তিনি (মুহাম্মদ ﷺ) তাঁর শিশুপুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুশয্যায় এসে দাঁড়িয়েছেন, তখন আল্লাহর মর্জির ওপর নিজেকে সপে দেয়ার মনোভাব তাঁর আচরণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। চরম দুঃখের সময় তাঁর এটুকু সান্তনা ছিল যে, অচিরেই তিনি পুত্রের সাথে জান্নাতে মিলিত হবেন। যখন ইবরাহিমকে কবরে রাখা হচ্ছিল, তখন তিনি পুত্রের জন্য দুআ করেছেন। যেন তাঁর পুত্র কবরের কঠিন পরীক্ষায় উত্তির্ণ হয়, আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর রিসালাতের ওপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকে।”
[Life of Mahomet, London, 1889, pp. 192-3, 199]
আমাদের নবী ﷺ মানবতার ভেতর মহানুভবতার খোজ করেছেন। হাতের ছোয়ায় তিনি সাধারণকে অসাধারণে পরিণত করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী।
(একাদশ পর্ব)
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহান আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও সাফল্যের পেছনে বড় একটি কারণ ছিল ‘নিজেকে জয় করা’। যতবার ধাক্কা এসেছে; ততবার আমার নবী নিজেকে সামলে নিয়েছেন। যতবার আঘাত করা হয়েছে; ততবার তিনি দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে এসেছেন। ফ্রেঞ্চ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আনফান্সো দ্য লেমার্টিন বলে দিয়েছেনঃ “মহান আদর্শ, সামান্য সরঞ্জাম এবং দীপ্তিমান সাফল্য- যদি এই তিনটি বিষয় দ্বারা মানুষের যোগ্যতা পরিমাপ করা হয়; তাহলে কার সাহস আছে মুহাম্মদের সাথে অন্য কাউকে তুলনা করার?”
[Histoire De La Turquie, Paris, 1854, vol. II, pp. 276-277]
মক্কায় যখন সাহাবিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলছিল, তখন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “এক দিন আসবে, যখন তোমরা রোম-পারস্যে ইসলামের পতাকা উড়াবে।” মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে মুসলমানরা রোম-পারস্য বিজয় করে নিয়েছেন।
তায়েফের মাটিতে পাথরের আঘাতে জর্জরিত অবস্থায় আমার নবী হাত তুলেছিলেনঃ “আল্লাহ, তুমি আমাকে কার হাতে ছেড়ে দিয়েছ? এই শত্রুরা কি আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে?” পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়েছেনঃ “আল্লাহ, যদি তুমি নারাজ না হও, তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।” [ইবনে হিশাম]
উহুদ যুদ্ধে প্রিয় চাচা হামযা রা.’র কাটাছেড়া দেহ দেখে বলেছেনঃ “আমি যখন বিজয়ী হব, তখন এক হামযার বিপরীতে তাদের ত্রিশটি লাশ এভাবে বিকৃত করব।” পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেনঃ “মৃতদেহ বিকৃত করা (Mutilation) ইসলামি শরিয়তে চিরতরে নিষিদ্ধ।”
৬ষ্ঠ হিজরিতে মক্কাবাসী মুশরিকদের কাছে নিজেকে প্রায় দমিয়ে রেখে হুদায়বিয়ার সন্ধি করেছিলেন আমাদের নবী ﷺ। সাহাবিরা বিষয়টি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। মক্কাবাসী ওই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার পর তাদের নেতা আবু সুফিয়ান একা একা মদীনার রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, যেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বুঝিয়ে-শুনিয়ে চুক্তিটি পুনরায় বহাল করা যায়। এক বছর আগে যারা লাগামহীন শর্ত জুড়ে দিচ্ছিল; এক বছর পর তারাই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে এসেছে। ব্রিটিশ ধর্মতত্ত্ববিদ এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি (১৯১৭) অ্যানি বেসেন্ট লিখেছেনঃ “যতবার আমি (রাসূলের জীবন) অধ্যয়ন করি, ততবার আরবের সেই মহান শিক্ষকের প্রতি আমার মনে এক নতুন শ্রদ্ধাবোধ, নতুন ভক্তি অনুভূত হয়।”
[The Life And Teachings Of Muhammad, Madras, 1932, p. 4]
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছিল সম্ভবত ৮ম হিজরিতে। না, আমি মক্কা বিজয়ের কথা বলছিনা। মক্কা তো আল্লাহর নবী ﷺ বিজয় করতেন-ই। ওটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ছিল। আমি বলছি, বিজয়ের যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেন, তার কথা। আল্লাহর নির্দেশ ছিলঃ
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
“যখন আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয় সমাগত হবে, তুমি দেখবে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দীনের মধ্যে প্রবেশ করছে। অতঃএব তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ” [সুরা নাসর : ১-৩]।
পার্থিব জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয়ের প্রাক্কালে আমার নবীর চোখে অহংকারের চাহনি ছিলনা, বল প্রদর্শনের কোনো চেষ্টা ছিলনা। আল্লাহর তরে মাথা নিচু করে ১০ হাজার সাহাবা নিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেছেন। পরনে ওই সাদাসিধে পোশাক, মাথায় কালো পাগড়ি। কণ্ঠে আল্লাহর হামদ-ছানা-তাসবীহ। তিনি মক্কায় ধ্বংসলীলা চালাতে নিষেধ করেছেন। নিজ হাতে কা’বা শরীফ পরিষ্কার করেছেন। আল্লাহর বান্দা হয়ে আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করেছেন। জাহেলি যুগে যাকে কেউ মানুষের মর্যাদা দেয়নি; আমার নবী সেই বিলালকে কা’বা শরীফের ওপরে উঠিয়ে দিয়েছেন। বলেছেনঃ “বিলাল, আযান দাও।” বিলাল তাঁর কন্ঠের সবটুকু জোর একত্রিত করে বলেছেনঃ “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার”।
শাস্তির আশঙ্কা বুকে নিয়ে অপরাধী মক্কাবাসী মাথা নিচু করে সামনে দাঁড়িয়েছে। আমার নবী ﷺ শান্ত কন্ঠে ঘোষণা করেছেনঃ “আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো প্রতিশোধ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।” ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্টেনলি লেন-পুল তাঁর Introduction to Higgins, Apology for Muhammad বইয়ে লিখেছেনঃ “সেদিন মক্কার রাস্তায় কোনো রক্ত ছিলনা কেন? লাশের ঢের পড়ে থাকতে দেখা যায়নি কেন? সত্যটি বিশ্বাস করা বড় কঠিন। এবং সেই সত্য হলো, সেদিন মুহাম্মদ কেবল তাঁর শত্রুদের ওপর বিজয় লাভ করেননি; বরং বিজয়ের সেই দিনে তিনি তাঁর নিজেকে জয় করে নিয়েছিলেন। অত্যাচারী কুরাইশদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সেদিন একটি ঘর লুটপাট করা হয়নি, একজন নারীকেও অপমান করা হয়নি।”
ইতিপূর্বে বা এরপরে, এরকম বিজয় মানবজাতি আর একটিও দেখেনি।
চলমান…
লেখক – মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী
প্রাক্তন শিক্ষার্থী,ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।