আমার নবী ﷺ-এর বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিকদের শেষ অস্ত্র হচ্ছে ডাহা মিথ্যাচার। এ দিক থেকে তৎকালীন আরবের মূর্খ আবু জাহেল যেমন, আজকের যুগের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীও তেমন। যুগ পরিবর্তন হয়েছে, শিক্ষাদীক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু মিথ্যা মিথ্যাই থেকে গেছে।
আমার নবী ﷺ প্রথম রাসূল নন, যাকে নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা হয়েছে। বরং ইতোপূর্বে প্রত্যেক নবী-রাসূলকে নিয়ে লোকেরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছে। আল্লাহ বলেছেনঃ
وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّن قَبْلِكَ
“নিশ্চয়ই আপনার পূর্ববর্তী রাসূলদেরকেও উপহাস করা হয়েছে” [সুরা আন’আম : ১০]
কিন্তু আমার নবী ﷺ-এর ব্যাপারটি ভিন্ন। অন্য নবী-রাসূলকে আল্লাহ এসব মিথ্যাচারের জবাব শিখিয়ে দিয়েছেন। আর আমার নবীর পক্ষ থেকে স্বয়ং বিশ্বজাহানের প্রতিপালক এসব ঠাট্টা-বিদ্রূপের জবাব দিয়েছেন। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেনঃ
إِنَّا كَفَيْنَاكَ الْمُسْتَهْزِئِينَ
“(হে নবী) বিদ্রূপকারীদের জন্য আমি আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট” [সুরা হিজর : ৯৫]
উদাহরণস্বরূপ, মুশরিকরা বলত, মুহাম্মদ ﷺ নিজে কবিতা রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহ স্বয়ং এ মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছেনঃ وَمَا هُوَ بِقَوْل شَاعِر “এটি (কুরআন) কোনো কবির কবিতা নয়” [সুরা হাক্কাহ : ৪১]। মুশরিকরা বলত, মুহাম্মদ ﷺ গণক। তিনি জিনের সাহায্যে ভবিষ্যত গণনা করেন। আল্লাহ এ কথারও জবাব দিয়েছেনঃ وَلَا بِقَوْل كَاهِن “এটি কোনো গণকের গণনা নয়” [সুরা হাক্কাহ : ৪২]। মুশরিকরা বলত, মুহাম্মদ ﷺ পাগল। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেনঃ
مَا أَنتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُون وَإِنَّ لَكَ لَأَجْرًا غَيْرَ مَمْنُون وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ فَسَتُبْصِرُ وَيُبْصِرُونَ بِأَييِّكُمُ الْمَفْتُونُ
“আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহে আপনি পাগল নন। আপনার জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার। নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। অচিরেই আপনি দেখবেন এবং তারাও দেখবে যে, তোমাদের মধ্যে প্রকৃত পাগল কে” [সুরা কলম : ২-৬]
সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত, আমার নবীর বিরুদ্ধে মিথ্যাবাদীদের মিথ্যাচার থামেনি। তাদের এহেন মিথ্যাচার আমাদেরকে কষ্ট দেয়। আল্লাহ নিজেই জানিয়ে দিয়েছেনঃ
وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا
“তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান) এবং যারা শিরক করেছে, অবশ্যই তাদের কাছ থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে” [সুরা আলে ইমরান : ১৮৬]
মধ্যযুগের পাদ্রীরা আমার নবীর ব্যাপারে প্রধানত তিনটি মিথ্যা চালু করেছিল।
এক. “মুহাম্মদ ছিলেন মৃগীরোগে আক্রান্ত।” বলাই বাহুল্য, এই নির্জলা মিথ্যা এক মূহুর্তের জন্য টিকে থাকতে পারেনি।
দুই. “মুসলমানরা মুহাম্মদের উপাসনা করে।” এটি কত বড় মিথ্যা, তা বলার প্রয়োজন নেই।
তিন. “মুহাম্মদ ৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেছেন।” যদিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, আমার নবী ﷺ ইন্তেকাল করেছেন ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। এ মিথ্যাচারের কারণ হচ্ছে, খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে ৬৬৬ (Triple Six) দাজ্জালের চিহ্ন। তাদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারছেন?
তবে এসব মিথ্যাচার না আমার নবীর কোনো ক্ষতি করতে পেরেছে, না ইসলামের প্রচার-প্রসার রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে। বরং যুগে যুগে পশ্চিমা পণ্ডিতরাই এসব মিথ্যাচার খণ্ডন করেছেন। আমরা সেদিকে যাব ইনশাআল্লাহ।
(৭ম পর্ব)
মানব জীবনের দুটি দিক থাকে। একটি ব্যক্তিগত, আরেকটি সমষ্টিগত। ব্যক্তিগত দিক হচ্ছে মানুষের বিশ্বাস (Creed/Dogma), ধর্মকর্ম (Modes of Warship), আচার-ব্যবহার (Modes of Behaviour) ইত্যাদি। এগুলো অনেকাংশে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার। সমষ্টিগত দিক হচ্ছে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক, শান্তি-সংঘর্ষ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় কার্যাবলী। এগুলো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করেনা। বরং পরিবেশ পারিপার্শ্বিকতার দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। আমার নবী ﷺ মহান কেন জানেন? আমার নবী মানব ইতিহাসের একমাত্র সংস্কারক, যিনি এই প্রত্যেকটি বিষয়কে সমানভাবে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। আমেরিকান দার্শনিক জন উইলিয়াম ড্রেপার বলেছেনঃ “রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর ৪ বছর পর, ৫৬৯/৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করে যিনি মানব সভ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তিনি মুহাম্মদ।”
[A History of the Intellectual Development of Europe, London, 1875, vol. 1, p. 329-330]
আরবরা ছিল তৎকালীন বিশ্বের নিকৃষ্টতম পৌত্তলিক। যে যমিনে বছরজুড়ে ৩৬০টি মূর্তির পূজা করা হত, সে যমিনে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করেছেন কালিমা তায়্যিবাহ لا اله الا الله (এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই)। এরচেয়ে বড় “ইনকিলাবি স্লোগান” মানবজাতি আর কখনও শুনেনি।
এই কালিমা তায়্যিবাহ ৩৬০ থেকে শুরু করে ৩৩ কোটি বানোয়াট খোদাকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছে। এই কালিমা তায়্যিবাহ বিলালের কণ্ঠে ‘আহাদুন আহাদ’ ধ্বনিরূপে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এই কালিমা তায়্যিবাহ উমরের ফরমান হয়ে শুষ্ক নীলনদকে পুনরায় প্লাবিত করেছে। এই কালিমা তায়্যিবাহ আলীর হাত হয়ে খায়বার দুর্গের দরজা টেনে ছিড়ে ফেলেছে। এই কালিমা তায়্যিবাহ শিখিয়েছে- আদেশ আল্লাহর, নিষেধ আল্লাহর, সন্তুষ্টি আল্লাহর, অসন্তুষ্টি আল্লাহর, ভালোবাসা আল্লাহর জন্য, ঘৃণা করা আল্লাহর জন্য, অর্জন আল্লাহর জন্য, ত্যাগ আল্লাহর জন্য, চাওয়া আল্লাহর কাছে, না চাওয়াও আল্লাহর কাছে, জীবন আল্লাহর জন্য, মরণ আল্লাহর জন্য।
একবার এক বেদুইন আমার নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে এমন একটি কথা বলে দিন, যেন আর কখনও আমাকে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে না হয়। রাসূলুল্লাহ বললেনঃ قُلْ آمَنْت بِاَللَّهِ ثُمَّ اسْتَقِمْ “তুমি বলো, আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম। অতঃপর এর ওপর টিকে থাকো।”
[সহীহ মুসলিম ; কিতাবুল ঈমান, আরবাঈন ; ইমাম নববী]
বিপ্লব এখানেই শেষ নয়; এ তো কেবল শুরু। জন উইলিয়াম ড্রেপারের সূত্র ধরে বলছি, ৫৬৬ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নামটিও আজ কারো মনে নেই। এর মাত্র ৪ বছর পর আরবের মরুভূমিতে জন্মগ্রহণ করা এক ইয়াতিম শিশু মানব ইতিহাসের পুরো গতিপথ পাল্টে দিয়েছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার জন্য আমার মা-বাবা কুরবান হোক।
চলমান….
লেখক – মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী
প্রাক্তন শিক্ষার্থী,ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।