
কবি মুজাহিদ বুলবুলের কন্ঠে সম্প্রতি রিলিজ হওয়া মরমী নাশিদ “হান্নান ও মন্নান” ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রখ্যাত মরমী সাধক ইবরাহীম তশ্না রহ. রচিত মরমী সংগীতটি ৮ নভেম্বর, শুক্রবার মুজাহিদ বুলবুলের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে রিলিজ হয়।
রিলিজের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো দিনের মরমী সংগীতটি শ্রোতাদের মনে দাগ কেটেছে, গানটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রোতারা নানারকম প্রশংসামূলক অভিব্যক্তি শেয়ার করছেন।
কবি ও শিকড় সন্ধানী লেখক সরওয়ার ফারুকী লিখেন, “ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক, মরমি কবি ইবরাহিম তশ্নার রচিত গানগুলো একসময় এ অঞ্চলের মানুষের মুখেমুখে ফিরত। তিনিই প্রথম বাঙালি দেওবন্দী আলিম— যিনি বাংলা ভাষায় গান রচনা করে সফলভাবে সমকালীন মানুষের মুখে তুলে দিতে পেরেছেন এবং আধ্যাত্মিক আবেদনে ভরপুর এসব গানের মজলিশ মসজিদ, মাদ্রাসায় সাধারণ জনতাকে নিয়ে গাইতে পেরেছেন। এ প্রজন্মের জনপ্রিয় ইসলামি গানের শিল্পী মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল নতুনভাবে ইবরাহিম তশ্নার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার অভূতপূর্ব কণ্ঠের জাদুজালে আবারও তশ্নার গানগুলো মানুষের মুখেমুখে ধ্বনিত হবে— সে প্রত্যাশা রইল।”
লন্ডন প্রবাসী, কবি ও গীতিকার মাওলানা এম এ বাছিত আশরাফ বলেন, ” আধ্যাত্মিক নগর সিলেটের গর্বিত সন্তান ও ব্রিটিশ বিরুদ্বী আন্দোলনে বীর সিপাহশালার মরমি কবি আল্লামা ইবরাহীম তস্না রাহিমাহুল্লাহ (১৮৭২-১৯৩১) সিলেট জেলার অন্তর্গত কানাইঘাট উপজেলার বাটইআইল গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। ফারসি ‘তস্না’ শব্দের বাংলা প্রতিরূপ ‘তৃষ্ণার্থ’ বা ‘পিপাসার্থ’। হুব্বুল্লাহ ও হুব্বে রাসুলে ‘তৃষ্ণার্থ’ হয়ে ইবরাহীম তস্না রাজনৈতিক ময়দান ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক চর্চায় নিমগ্ন হন। এক সময় তস্না রাহঃ মাওলার দিদার লাভের আশায় উদাসীন জীবন যাপন করতে শুরু করেন, এ সময় তাঁর অন্তর থেকে উৎসারিত হয় মরমি গানঃ আমি তোমায় ডাকিরে তুমি হান্নান ও মান্নান বন্ধুরে।। এই গান তাঁর মাওলা প্রেমের সাধনার ফসল। বাঙলা সাহিত্যকে তিনি তার আধ্যাত্মিক রচনাশৈলী দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর গানে ধ্বনিত হয়েছে মানবহৃদয়ের গভীর ভালোবাসা ও এলাহি প্রেমের আধ্যাত্মিক বাণী। তিনি ছিলেন সুফি কবি শিতালং শাহের ভাবশিষ্য, বাঙলা-উর্দু-ফারসি সহ বহুসংখ্যক মরমি সঙ্গীতের রচয়িতা এই গুণী কবির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত গ্রন্থ “অগ্নিকুণ্ড”। মুজাহিদ বুলবুল একজন সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীতসাধক। তিনি একাধারে দাঈ ইলাল্লাহ, গীতিকার, সুরকার । আমরা জানি যে, বাংলা ভাষায় ইসলামী গানের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ডিজিটাল যুগে অপসংস্কৃতির অন্তরালে যখন ইসলামী গান অবহেলিত হচ্ছিল ঠিক তখনই নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করেন যে সব ইসলামী সংগীত সাধকেরা মুজাহিদ বুলবুল তাদের অন্যতম। ৮০/৯০ দশকে আমার উস্তাদ ও মুরব্বীদের ইশকের মাহফিলে এই গজলটি আবেগের সাথে গাইতে শুনতাম, কবি মুজাহিদ বুলবুলের কন্ঠে সেই আধ্যাত্নিক গানটি শুনে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছে। এমন কথা আর সুর আমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে বিচরন করছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বুলবুলে ফুলতলীর কন্ঠে ও সাধনায় বরকত দান করুন। মক্ববুল ওলীদের রুহাণী ফয়েজ নসিব করুন।
একাত্তর টিভির সাংবাদিক ছড়াকার লুৎফুর রহমান লিখেন, ”এই সংগীতটা কাল জয় করতে পারে ভাই। এটা ছড়াই দেন সব জায়গায়। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এটা মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হবে। ঘুম থেকে উঠেই এটা শুনলাম। আমি আর আমার মেয়ে আপনার এই সংগীত খুব উপভোগ করেছি।”
শাবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান লিখেন, ”বুলবুলে সিলহেট গীতিকার মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের “হান্নানও মন্নান বন্ধুরে” সঙ্গীতটি সিলেটের লোক সংস্কৃতিতে নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। সিলেটের লোকসংগীত বলতে আমরা কেবল বাউলগান আর ঘাটুগানের কথা জেনেছি। সঙ্গে আছে ধামাইল নাচ। ধর্মীয় সঙ্গীত বলতে বড়জোর হাসন রাজার মরমি গান। তার উপরে আরকুম শাহের গানকে সিলেটি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সিলেটে হযরত শাহজালাল রহ. সময়েই নাগরী লিপিতে সিলেটি সাহিত্যের বিকাশ লাভ করে। বাংলা বর্ণমালা তখন শিশু অবস্থায়। সিলেটি নাগরী পুঁথিগুলোতে নজর দিলেও প্রাচীন সিলেটি ইসলামী সংস্কৃতির চিহ্ন পাওয়া যায়। হায়াতুন্নবীর পুঁথি বা জঙ্গনামা সবকটিই ছিল ধর্মীয় ভাবধারার পুঁথি। অথচ আমরা পুঁথি বলতে কেবল জানি ভেলুয়ার রূপের কাহিনি কিংবা কমলার বনবাসের কথা। অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশে এভাবেই আমাদের অতীতকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, যা এখনও চলমান। বাউলের আখড়ার বই লিখলেই মিলেছে বাংলা একাডেমির পুরস্কার বা একুশে পদক মিলছে। বাস্তবে ঘাটুগান, যাত্রাগান এসব কোনো কালেই সুসভ্য মানুষের রুচির খোরাক ছিল না। হাওর অঞ্চলের ধর্মবিমুখ নওজোয়ানরা হয়তো হিন্দু বাড়িতে গিয়ে এসব গান শুনতো। তাহলে সিলেটের মুসলমান সমাজের লোকসংগীত কী ছিল? উত্তর হলো, হান্নানও মন্নান বন্ধুর গান।
ছোটবেলায় দেখেছি বয়স্ক মুরব্বিরা দুপুরে মাঠে গরু ছেড়ে গাছতলায় বসে আছেন।মনে অজান্তেই গেয়ে উঠছেন— ও দয়ার আল্লাজি, আমারে তোমার বাড়িত নিবায় নি? গ্রামে বিদ্যুত পৌঁছার আগে এশার নামাজ শেষে রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষারত মুরব্বিদের গাইতে শুনেছি— করিম ও রহিম আল্লাহ সত্তার গফফার, মাফ করো দয়ার আল্লাহ আমি গোনাহগার। এসবই হলো আমাদের লোকসংগীত। যা গাওয়ার জন্য মঞ্চ সাজানোর প্রয়োজন হতো না। আজকালকার ভার্চ্যুয়াল, আর্টিফিশিয়াল যুগে এসব সঙ্গীত নিতান্ত মেঠো। ইসলামী সঙ্গীত শিল্পীরা ভিন্নদেশীয় গানের সুর নকল করে না’ত গাইতে লজ্জাবোধ করেন না। ইসলামী সংগীত শিল্পীদের আধুনিক হওয়ার মনোভাব আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার যাঁতাকলে পড়ে বাউল আর ঘাটুগানই আমাদের পূর্বপুরুষদের সংস্কৃতি হিসেবে দলীলপত্র, পুস্তকে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
আউল বাউল নয়, শাহ শিতালং ও ইবরাহীম তসনা-দের রাগসঙ্গীতই ছিল আসামের সিলেটের মুসলমান সমাজের আত্মার খোরাক।
এই বিষয়ে একটি বই লিখতে চেয়েছিলাম। মনে হলো, বিকল গাড়িকে জাদুঘরে রাখলে সংরক্ষণ হয় সচল হয় না। লোকসংগীতকে গ্রন্থবদ্ধ করে রক্ষা করা সম্ভব নয়। ইচ্ছে ছিল সময় ও সামর্থ্য থাকলে শিশুদের দিয়ে এসব গাওয়ানোর চেষ্টা করব৷ প্রতিযোগিতার আয়োজন করব৷ শিতালং শাহের ‘ সুয়া উড়িল রে’ গান কত হাজার বার শুনেছি। কিন্তু বাদ্যবাজনা ছাড়া ভার্সন অপ্রতুল। আজ দেশের নামযশ একজন গীতিকার আমাদের শেকড়ের সঙ্গীত কণ্ঠে তুলেছেন। তাঁকে হাজারো মুবারকবাদ। এসব সঙ্গীত আমাদের বাবাদের মনের খোরাক হবে। সিলেটি মুসলমান সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করবে।
আশা করছি শিগগির প্রিয় গীতিকারের কণ্ঠে শুনব শিতালং শাহের অনবদ্য না’ত : তুকাইলে বন্ধুরে পাইবায়, আছইন বন্ধু ছিরিপুর; আগে চিনো মুহাম্মদী নূর।”
সৌদি আরব প্রবাসী, মসজিদে নাওই মসজিদের ইমাম মাওলানা শামসুল ইসলাম লিখেন- ”
হান্নান ও মান্নান গজল টি যুগ যুগ ধরে ইসলাম আর মুসলমানদের আত্মার খোরাক! মহান আল্লাহর সাথে বান্দার নিবিড় সম্পর্ক বলে দেয়! কিংবদন্তি সংগীত শিল্পী মাওলানা কবি মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের গাওয়াতে গজল টি আবারও সংগীতাংগনে সাড়া ফেলেছে! গতকাল রাতে বুলবুল ভাইয়ের সাথে সৌদি আরব থেকে কল করি শুভেচ্ছা জানাই, আল্লাহ পাক ভাইয়ের গাওয়া কে কবুল করুন, ভাইয়ের হায়াতে বরকত দান করুন, আমিন।
নকশী বাংলা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম জয়নাল বলেন- ” অনুভূতি- আল্লামা ইব্রাহীম তশনা রাহিমাহুল্লাহ রচিত মরমি সংগীত ‘হান্নান ও মন্নান বন্ধুরে” সংগীতটি কবি মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের কন্ঠে —
আধ্যাত্মিক জগতের কিংবদন্তী মরহুম ইব্রাহীম তশনা রাহিমাহুল্লাহ এর বিখ্যাত মরমি সংগীত “হান্নান ও মন্নান বন্ধুরে – সংগীতটি বর্তমান সময়ের আধ্যাত্মিক চেতনার সংগীত শিল্পী, প্রিয় ভাই কবি মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের সুর ও কন্ঠে গাওয়া সংগীতটি বেশ কয়েকবার শুনেছি এবং হ্রদয়ে এক শান্তির প্রভাব অনুভূত হয়েছে । মুলত আগেকার সময়ে সিলেটের ঘরে-ঘরে মরমি সংগীতের চর্চা হতো এবং এটাই ছিল আমাদের ঐতিহ্যের সংগীত। কালক্রমে মরমি সংগীত হারিয়ে যেতে বসেছে। আজকাল ইসলামি সংগীতের নামে অনেক আধুনিকতা এসেছে আর আধুনিকতার কবলে ইসলামি সংস্কৃতির মুল লক্ষ্য-উদ্দ্যেশ্য অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে।
আমার একজন প্রিয় মরমি কবি ছিলেন, শেকড় সন্ধানী লেখক ও গবেষক মরহুম সৈয়দ মোস্তফা কামাল রাহিমাহুল্লাহ। তিঁনি মরমি সংগীত নিয়ে অনেক কাজ করেছেন যখনই উনার কাছে বসার সুযোগ হত শিতালংগী রাগ শোনাতাম রিডিং পড়ার মতো তখন তিঁনি গাইতেন এবং চোখের পানি গড়গড়িয়ে পড়তে দেখেছি। আমার বাবা-চাচাদেরকে দেখেছি শিতালংগী কিংবা ইব্রাহীম তশনা রাহিমাহুল্লাহ এর মরমি সংগীত গুলো মাগরিবের নামাজের পরে প্রায়ই গাইতেন এবং অঝোরে চোখের পানি পড়তে দেখেছি। সেই মরমি গানের আধ্যাত্মিকতা কিংবা ভাবার্থ এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এগুলো শুনলে মুমিনের ঈমান বাড়ে এবং আধ্যাত্মিকতার অনুপ্রেরণা জোগায়।
আমি আশাকরি, কবি মুজাহিদুল ইসলাম বুলবুল ভাইয়ের কাছ থেকে আগামীতে আরো বেশি করে আমাদের সিলেটের মরমি সংগীতগুলো শুনতে পারবো। আল্লাহ তায়ালা যেনো আপনার নেক হায়াত এবং সুস্থ জীবন দান করেন সেই দুয়া করছি আল্লাহ তায়ালার নিকট।”
জকিগঞ্জ টিভির ডিরেক্টর জামাল আহমদ লিখেন, ”আমার মমতাময়ী ‘মা’ ঘরে যখন কাজ করতেন তখন গুনগুনিয়ে গাইতে শুনতাম, যতবার গাইতেন ততবার-ই বাবার গল্প আসতো মা বলতেন প্রতিদিন তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে বাবা আমার এই গজল গেয়ে গেয়ে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতেন। আজ ফরিয়াদ মূলক গজলটি রিলিজ হওয়ার পর থেকে বারবার শুনছি। আমার যদি আজ জীবিত থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি খুবি খুশি হতেন গজলটি শুনতে পেয়ে। আল্লাহ কবি মুজাহিদ বুলবুল ভাইয়ের নেক হায়াত দান করুন।”
এ বিষয়ে কবি মুজাহিদ বুলবুল বলেন, ”মাওলানা ইবরাহীম তশ্না রহ.-এর লেখা এই গানটি আমার দাদা গাইতেন, বাবাকেও প্রায়ই গুনগুন করতে শুনি, এখন আমি গাইলাম, অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। এমন কথা আর সুরের সাথে মূলত আমাদের নাড়ির টান। গানটি রিলিজের পর থেকে যাঁরা আমাকে অভিনন্দ জানিয়েছেন, দোয়া করেছেন, তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। পুরনো দিনের গান নিয়ে কাজ অব্যাহত থাকবে ইনশা আল্লাহ্।”