সংকটে আত্মপরিচয় – রেদ্বওয়ান মাহমুদ

Spread the love


‘আমাদের পরিচয়ের একটা ভাগ আছে, যাহা একেবারে পাকা আমার ইচ্ছা অনুসারে যাহার কোনো নড়চড় হইবার জো নাই। তাহার আর একটা ভাগ আছে যাহা আমার স্বোপার্জিত, আমার বিদ্যা ব্যবহার ব্যবসায় বিশ্বাস অনুসারে যাহা আমি বিশেষ করিয়া লাভ করি এবং যাহার পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব নহে। যেমন মানুষের প্রকৃতি, তাহার একটা দিক আছে যাহা মানুষের চিরন্তন, সেইটেই তাহার ভিত্তি, সেইখানে সে উদ্ভিদ ও পশুর সঙ্গে স্বতন্ত্র, কিন্তু তাহার প্রকৃতির আর একটা দিক আছে যেখানে সে আপনাকে আপনি বিশেষভাবে গড়িয়া তুলিতে পারে, সেইখানেই একজন মানুষের সঙ্গে আর একজন মানুষের স্বাতন্ত্র।’ নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আত্মপরিচয় প্রবন্ধে এভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন আত্মপরিচয়ের মাহাত্ম্য।

মানবজীবনের অমূল্য পাওয়া হিসেবে এই আত্মপরিচয়কে বিবেচনা করা হয়। হোক সেটি জাতিগত, বংশগত, পরিবারগত কিংবা স্ব-উপার্জিত। বাঙালি হিসেবে আমাদের যে জাতিগত পরিচয়, তা বহন করে এদেশের সকলেই। কিন্তু বংশগত কিংবা পরিবারগত আত্মপরিচয় একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম। আভিজাত্য থেকে নিম্নমান। আবার বংশানুক্রমিকভাবে পেয়ে যাওয়া এই পরিচয় পরিবর্তনের উপায় হলো নিজের পরিচয় নিজে নির্ধারণ করা।
আত্মপরিচয় নিয়ে এত কথার কারণ হলো প্রকট আকার ধারণ করা ‘আত্মপরিচয় সংকট’। নিজের পরিচয় নিজেই ভূলে যাওয়া। যে সংকটে ভূগতে দেখা যায় অনেককেই। আমরা যখনই স্বাভাবিকতার ব্যতিক্রমের মধ্য দিয়ে যাই তখনই ঘটে বিঘ্নতা-বিচ্যুতি। একটা সময় নিজের আচরণ আত্মপরিচয় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অথচ যে ঘটনা ‘এই গাড়ি সাইড করেন’ থেকে ‘হারামজাদা’ পর্যন্ত পৌঁছালো তা নিছক স্বাভাবিকভাবেই শেষ হতে পারতো।

দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা নতুন ইস্যুর কারণ হতো না।

আগে দেখা যেত মধ্যগ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকেরা দেশে আসার পর কেউ কেউ ওদেশের জোব্বা পরে ঘুরছেন এবং সুযোগ পেলেই আরবিতে কথা বলছেন। মূলত মালিকদের দেখে-দেখে তারা স্বকীয়তা ভূলে গেছেন। এই পোশাক গায়ে দিলে তাদের ধারণা- আরবীতে কথা বলতে হয়, চোখ টান-টান করে তাকাতে হয়, লম্বা পায়ে হাঁটতে হয়, অহংবোধ নিয়ে চলতে হয় ইত্যাদি। অথচ জোব্বা গায়ে দিলেও সব সাধারণ মানুষের মাঝে অসাধারণভাবে মিশে যেতে পারলে এটি নিতান্ত স্বাভাবিক হিসেবেই থেকে যেত। সাম্প্রতিক সময়ে এলিফ্যান্ট রোডে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট আর চিকিৎসকের উত্তপ্ত বাকবিতন্ডা বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। কোথায় থেকে শুরু আর কোথায় গিয়ে শেষ! অথচ যে ঘটনা ‘এই গাড়ি সাইড করেন’ থেকে ‘হারামজাদা’ পর্যন্ত পৌঁছালো তা নিছক স্বাভাবিকভাবেই শেষ হতে পারতো। দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা নতুন ইস্যুর কারণ হতো না।

প্রথমত যে বিষয়টি আমাদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা উচিত তা হলো পুলিশের চেকপোস্টে গাড়ি থামানো ‘অপমানসূচক’।

পুলিশ মানেই হয়রানি কিংবা সকল পুলিশ সমান এই কথাদ্বয় থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রথমত যে বিষয়টি আমাদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা উচিত তা হলো পুলিশের চেকপোস্টে গাড়ি থামানো ‘অপমানসূচক’। পুলিশ মানেই হয়রানি কিংবা সকল পুলিশ সমান এই কথাদ্বয় থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। চেকপোস্টে দাঁড়ানো একজনের পুলিশের কাজই হলো গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, তল্লাশি কিংবা প্রয়োজন অনুসারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। অথচ প্রায়ই রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে কথিত ভিআইপিরা গাড়ি আটকানোর বিষয়কে নিয়ে তুমুল কান্ড ঘটিয়ে ফেলেন। আবার পুলিশের হয়রানিমূলক আচরণের বিষয়টিও কম ঘটছেনা। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। ফিরছি এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনায়।
বিবিসি নিউজের তথ্যমতে- ভিডিওর শুরুতেই দেখা যায় ওই ডাক্তার কিছুটা ক্ষিপ্ত মেজাজেই পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটকে বলছেন- ‘আমি আইডি কার্ড নিয়ে আসি নাই’।
পুলিশ যখন জানতে চাইল ‘আপনার মুভমেন্ট পাস আছে?’
ওই ডাক্তার গাড়ির স্টিকার দেখিয়ে বললেন ‘এই যে মুভমেন্ট পাস।’
তখন সাদা শার্ট পরিহিত ব্যক্তি যিনি ম্যাজিস্ট্রেট বলে জানা যাচ্ছে তিনি বলেন ‘আমিতো ওটা দেখতে চাচ্ছি না। আপনার মুভমেন্ট পাস আছে কিনা। আপনার আইডি কই?’
তখন ওই ডাক্তার জবাব দেন, ‘ডাক্তারের মুভমেন্ট পাস? কতজন ডাক্তারের প্রাণ গেছে করোনায়?
এক পর্যায়ে ওই ডাক্তার নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বলেন, তিনি বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে সাঈদা শওকত। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের এক পর্যায়ে তিনি পুলিশ এবং কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করলে তারাও ক্ষিপ্ত হন। সাঈদা শওকত উত্তেজিতভাবে বলতে থাকেন ‘ডাক্তার হয়রানি বন্ধ করতে হবে’।

এই পুরো ঘটনায় পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা চিকিৎসক যে কেউ নিজ জায়গা থেকে একটু সহনশীল হলেই বিষয়টি এতদূর পর্যন্ত গড়াতো না। চিকিৎসকের গায়ে নামসহ এপ্রোন পরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের লগো সংবলিত স্টিকার, আইডি কার্ড সাথে আনেননি বলার পরও মুভমেন্ট পাস দেখতে না চাইলেই হতো। যেহেতু কার্ড সাথে আনেননি তাই ঠান্ডা মেজাজেও বিষয়টা শেষ করা যেত। এই ঘটনার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের পর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছেন এটি।
‘আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ বলে জোর আওয়াজ করতে থাকা চিকিৎসক-পুলিশের উত্তপ্ত আচরণ কি আত্মপরিচয় সংকটের প্রতীক বহন করছে না? সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের আচরণ আরেকটু নিয়ন্ত্রণে রাখলেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটির জন্ম হতো না। এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিকিৎসক পাল্টাপাল্টি বিবৃতি প্রদান করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ দুটো পেশাকে এভাবে মুখোমুখি করা দেশের একজন নাগরিক হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত বলেই মনে করি। সর্বত্র আত্মপরিচয় সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে নিজেকে জানা এবং সহনশীলতা চর্চার অনুরোধ জানাই।

লেখক-শিক্ষার্থী, সদস্য এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি।


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *