বিশ্বাস – গল্প

Spread the love

বিশ্বাস
জুয়েল মাহমুদ

(১ম পর্ব)

“তোমরা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হইও না” আল্লাহ তার বান্দাদের নিরাশ করেন না। যতো বাধা আসুক;বিশ্বাসের উপর অটল থেকো!

উক্ত কথাগুলো ছোটবেলা আফামিরা একটি ইসলামি বইয়ে পড়ছিলো। পড়ার পর-ই এই কথাগুলো তার অন্তরে গেঁতে গিয়েছিলো।
সব সবময়-ই আল্লাহর উপর ভরসা করতো।

আফামিরা মাদরাসার ছাত্রী। বাবা হাশমত মিয়া দিনমজুর। তিনিও বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। ঠিকমতো কাজে যেতে পারেন না। চামড়াও ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে। তাদের পরিবারটা খুব অভাবের, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা।

পাড়ার এক প্রতিবেশির আর্থিক সহোযোগিতায় দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে পড়াচ্ছেন।

আফামিরা মাস্টার্স প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্রী। ভালো ফলাফল ও চরিত্রের জন্য পাড়া বেশ সুনাম রয়েছে। পাড়ার আট দশটা মেয়ের মতো না সে। আফামিরা খুব পর্দাশীল। পাশের বাড়িতে একটা টিউশনি করতো আফামিরা মাস শেষে পেতো ৩ হাজার টাকা। সেগুলো দিয়ে বাবার চিকিৎসা চালাতো।

বাবা কতোদিন পৃথিবীতে থাকবেন তার কোনো ঠিক নেই। সবে মাত্র গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করছে। সে নিরবে নিবৃতে চাকরি খুঁজছে। কিন্তু মামা চাচা না থাকলে কি এ যুগে চাকরি হয়? চাকরি না পাওয়ার প্রধান অন্তরায় হচ্ছে পর্দা।
পর্দা করা মেয়েকে চাকরি দিয়ে কি করবে? আজকালকার মর্ডান যুগে কি পর্দা মানায়?

তবুও সে আল্লাহর উপর আস্থা হারায় নি। চাকরির জন্য অফিসের দোয়ারে দোয়ারে হাঁটছে আর বলছে আল্লাহ হয় তো আমার জন্য এর ভালো চাকরি রেখেছেন।

শেষ ইন্টারভিউতে যখন গেলো তখন অফিসের বস তাকে পর্দা খুলতে বললেন কিন্তু সে পর্দা খুলতে রাজি হয় নি। বসকে বুঝিয়ে বললো আমি মুসলিম আমার উচিৎ মাহরাম ব্যতীত কারো সম্মুখে পর্দা না খুলা।

অফিসের বস তার এসব কথা শুনে মুগ্ধ হলেন এবং তাকে চাকরির এপোয়েন্টমেন্ট লেটারটি দিয়েই দিলেন। জয়েনিং পরের মাসে এখনো ১৫ দিন বাকী। জয়েনিংয়ে ৪০ হাজার টাকা বেতন।

সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালো। “শুকরিয়া খোদা,তুমি শ্রেষ্ঠ বিধানকারী”

পরদিন বাবা ফজরের নামাজ পরে হালকা চা-নাস্তা খেয়ে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। সকালের পরিবেশ চারিদিক নিরব নিস্তব্ধ। বাবা মেয়ের সাফল্যের কথা চিন্তা করছেন আর মনে খুব শান্তি পাচ্ছিলেন। এসব চিন্তায় আনমনা হয়ে তিনি রাস্তা পার হচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা মেরে চলে গেলো। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

আশেপাশের পথচারীরা তাকে তাৎক্ষণিক হসপিটাল পৌঁছালো। মেয়ের কাছে ফোন এলো আপনার বাবার অবস্থা ভালো না।তিনি এক্সিডেন্ট করেছেন এখন-ই রক্ত লাগবে তাড়াতাড়ি আসেন।

আফামিরা হতভম্ব হয়ে পড়লো। কি করবে বুঝতে পারছিলো না শুধু বুঝতে পারলো সে বাবার কাছে যাবে। তাড়াতাড়ি সিএনজি করে হসপিটালে পৌছলো। ডাক্তার থাকে বাবার ব্লাড গ্রুপ হাতে দিয়ে বললো ব্লাড যোগার করতে তাদের কাছে এই গ্রুপের ব্লাড নেই।

সে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। সহজ সরল মেয়েটি যেনো আরো বোকা হয়ে গেল। তাকে কোনো দিন এসব সমস্যায় পড়তে হয় নি যে।

কয়েকটি যায়গায় গেলো কিন্তু কোত্থাও রক্ত পেলো না।রক্ত থেকেও কি দিচ্ছে না তার মনে সন্দেহ হলো। ভাবলো টাকা ছাড়া কি তাদের হাত নড়ে না?আল্লাহ কবে তাদের মনকে প্রশান্ত করবেন?মানুষ কতো যে বিপদে আছে তারা কি তা বুঝে না? সে ভেঙে পড়লো না। মনে শক্তি রাখলো নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন।

শেষমেশ খালি হাতে হসপিটালে আসলো। এসে দেখলো তাদের পাড়ার অজানা এক যুবক রক্ত দিয়ে দিছেন।

সে আল্লাহর কাছে আবারও শুকরিয়া আদায় করলো। পাশাপাশি আবারো চিন্তায় পড়ে গেলো বাবার অবস্থা তো গুরুতর। তাদের কাছে এখনো কোনো টাকা নেই। সাথে আছে মাত্র দু’হাজার টাকা। টাকার ব্যবস্থা কিভাবে করবে তা নিয়েও চিন্তার শেষ নেই। মনে মনে খোদার কাছে ফরিয়ারদ করলো “হে খোদা তুমি-ই আমাদের শেষ ভরসা, আমাদের ভরসাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না”

বাবার চিকিৎসা করছেন ডাক্তার এনায়েত। সুঠাম দেহের অধিকারী তিনি।কয়েকদিন আগেই এমএমবিবিএস পাশ করছেন।

এদিকে টাকার চিন্তায় অস্থির আফামিরা। ভাবলো বাড়িতে মায়ের কিছু গয়না আছে এগুলো বিক্রি করে অন্তত অনেক টাকা পাওয়া যাবে।
এগুলা মায়ের রেখে যাওয়া শেষ স্মৃতি। কিভাবে এগুলো বিক্রি করবে? কষ্ট বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তবুও ভাবছে বাবাকে যদি বাঁচাতে না পারি। তবে মায়ের আত্মা খুব কষ্ট পাবে।
তখন কি হবে এগুলো দিয়ে? পড়ে-ই তো আছে। এখনো সময় এগুলো কাজে লাগাবার।

সে বাড়ির দিকে ছুটে গেলো। গয়নাগুলো নিয়ে-ই তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলো। সময় যে তার হাতে খুব কম। গয়নাগুলো বিক্রি করে চল্লিশ হাজার টাকা পেলো।

বিক্রি করে সে হসপিটালের দিকে যাচ্ছে । কাছে-ই হসপিটালটা তাই হেঁটে-ই রওয়ানা হলো।
কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! মধ্য পথে একদল ছিনতাইকারী তার পথ রুখে দাঁড়ালো। বললো “যা কিছু আছে দিয়ে দেন! নইলে অবস্থা ভালো হবে না”।

অনেক বুঝালো কিন্তু কে কার কথা শুনে?মেয়েটি অনেক চিৎকার করলো। কিন্তু কেউ তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো না। ঝাপটি মেরে ব্যাগ নিয়ে ওরা পালিয়ে গেলো। চোর কি শুনে কখনো ধর্মের কাহিনী?
মনে মনে ভাবলো এ-শহরের মানুষগুলো কি এতো স্বার্থপর!

অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু বেয়ে পড়তে লাগলো। তার গলা শুকিয়ে যেতে লাগলো। সে পানি পান করবে! তাও তার কাছে টাকা নেই।

পিপাসায় কাতর হয়ে ফিরলো হসপিটালে সেখানে পানি পান করলো। পানির গ্লাস হাত থেকে রাখতেই তার কাছে তার বান্ধবীর ফোন এলো। বান্ধবী বাবার চিকিৎসার খোঁজ-খবর জিজ্ঞেস করলো। সে তার বান্ধবীবে সব কিছু খুলে বললো। বান্ধবী তাকে নিরাশ না হওয়ার জন্য বললো।

আফামিরা আল্লাহর কাছে আবার প্রার্থনা করলো “হে আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করো, তুমি-ই আমাদের রক্ষা করতে পারো খোদা”

তার অনেকক্ষণ পর সবকিছু তার সাথে গল্পের মতো হতে লাগলো।
খবর এলো ক্যাশ কাউন্টারে কে যেনো একলক্ষ টাকা বাবার চিকিৎসার জন্য দিয়ে গেছেন।
চিকিৎসক জানালেন চিকিৎসার টাকা রেখে বাকীগুলো আপনাদের দিয়ে দেওয়া হবে।

আফামিরা একটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলো। আল্লাহর কাছে সেজদায় লুটিয়ে পড়লো “হে আল্লাহ এই অবাধ্যদে সাহায্য করার জন্য শুকরিয়া খোদা”

বান্ধবীর ফোন- কিরে? চাচাতো ভাইকে তোর কথা বলায় লন্ডন থেকে তোকে টাকা পাঠিয়েছেন!
পেয়েছিস?

(২য় পর্ব আসবে)


Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *